
দিনভর মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করেছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। বাবার জন্যও কিছু জিনিস কিনেছিলেন। সন্ধ্যার পর বন্ধুস্থানীয় এক ছোট ভাইয়ের ডাকে বাসা থেকে বের হন। রাতে মাকে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, বাসায় ফিরছেন। কিন্তু আর ফেরেননি। পরদিন বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যুর পর তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মঙ্গলবার সেটি নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর এক স্বজন।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম ও এক স্বজনের সঙ্গে কথা বলে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার আগের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে থাকতেন তাহসিফ। তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম প্রথম আলোকে জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় দ্বীপ নামের এক ছোট ভাই বাসার নিচে এসে তাঁকে ডাকেন। দ্বীপের সঙ্গে কথা বলে ফিরবেন জানিয়ে নিচে নামেন তাহসিফ। এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর মা একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে পাননি। রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মুঠোফোনে একটি বার্তা পাঠান তাহসিফ। তাতে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন। তবে বার্তাটি পড়ে ছেলেকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান এনায়েতুল করিম।
এরপরও তাহসিফ বাসায় না ফেরায় তাঁর খোঁজ করতে থাকে পরিবার। বুধবার দুপুরে তুরাগ থানায় যান বাবা এনায়েতুল করিম। তখন ছেলের বিষয়ে তাঁকে কিছু জানাতে পারেনি পুলিশ। এরপর ওই দিন বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে উত্তরখান থানা থেকে ফোন পান এনায়েতুল করিম। তাঁকে জানানো হয়, ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের ভাসমান লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি।
এনায়েতুল করিম জানান, যেখান থেকে ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, সেদিকে তাহসিফ কখনো যেতেন বলে তাঁদের ধারণা নেই।
দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন তাহসিফ। তাঁর একটি মোটরসাইকেল ছিল। মাসখানেক আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন তিনি। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে মোটরসাইকেল চালাতে নিষেধ করা হয়েছিল।
এক স্বজন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেলটি সঙ্গে নিয়েছিলেন তাহসিফ। সেটি কোথায় আছে, তা-ও তাঁরা জানতে পারেননি।
ওই স্বজন বলেন, ‘আমরা দ্বীপের সঙ্গেও কথা বলেছি। কিন্তু তাহসিফের বাইকটি মিসিং। পুলিশ আমাদের কাছে বাইকের ডিটেইলস, ছবি চেয়েছে। আমরা দিয়েছি, পুলিশ এটা বলতে পারবে।’
তাহসিফের সঙ্গে সেদিন কী ঘটেছিল, তা জানতে দ্বীপের সঙ্গেও কথা বলেছেন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বীপ তাঁদের জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে তাহসিফের সঙ্গে তিনি একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছিলেন। এরপর তাহসিফকে তাঁর বাসার এলাকার কাছে রেখে দ্বীপ ফিরে যান।
বিমানবাহিনীতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন তাহসিফ সাউরি। পরে তাঁর চাকরি চলে যায় বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, বিমানবাহিনী থেকে ছেলের চাকরি চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘শৃঙ্খলাজনিত’ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও নেত্র নিউজে কাজ করেন।
ছেলের স্বভাব সম্পর্কে এনায়েতুল করিম বলেন, ‘সে ছিল অত্যন্ত জেন্টেল প্রকৃতির ও সামাজিক। সিনিয়র-জুনিয়র সবার সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল।’
এদিকে তাহসিফের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা এখনো কোনো অভিযোগ পাননি। বিষয়টি দেখছে নৌ পুলিশ।
টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।