
প্রতিদিন সকাল ঠিক সাড়ে আটটা, বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধভাবে ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন এক নারী। এরপর তারই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় অ্যাসেম্বলি, জাতীয় সংগীত ও শারীরিক কসরত। সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ কক্ষে ফিরলে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের নির্দেশ দিয়ে প্রতিটি ক্লাসের খোঁজখবর নিতে শুরু করেন তিনি।
শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী নারী আর কেউ নন, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিআর বিলকিস।
‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা-২০২৬’-এ সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এই গৌরবময় পদকে ভূষিত করা হয়।
রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি। এর আগে, তিনি ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার, ৮ বার নারায়ণগঞ্জ জেলার এবং ২ বার ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে ভূষিত হন।
১৯৯৩ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে ২০০৩ সালে পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান বিআর বিলকিস। সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষানুরাগী পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ থেকে ২০২৬, দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষাঙ্গনে নিরলস অবদান রেখে চলেছেন তিনি।
বর্তমানে ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা এক হাজার ২০ জন এবং শিক্ষক রয়েছেন ১৩ জন। বিদ্যালয়টিতে উপস্থিতি প্রায় শতভাগ (৯৮-৯৯%)। এখানে শিক্ষার মান বাড়াতে বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ‘উত্তম’, ‘মধ্যম’ ও ‘পিছিয়ে পড়া’ এই তিন স্তরে ভাগ করা হয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া হয় বিশেষ ক্লাস, এমনকি শিক্ষকেরা রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়েও পড়াশোনার খোঁজখবর নেন। ফলে এখানকার ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই সাবলীলভাবে পড়তে ও লিখতে পারে। ২০২৫ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ৩৪ শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩০ জনই বৃত্তি লাভ করেছে।
শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে বিদ্যালয়ে চালু রয়েছে সততা স্টোর, পরামর্শ বক্স, সুন্দরভাবে সাজানো শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান মেলা এবং বাংলা, ইংরেজি ও গণিত অলিম্পিয়াড ক্লাব। এছাড়া প্রতি রোববার উদযাপন করা হয় ‘হ্যাপি সানডে’। প্রতি শনিবারে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে চালানো হয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান। প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে না থেকে প্রতিটি ক্লাসের জন্য খোলা হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপ, যার মাধ্যমে অভিভাবকেরা সহজেই বাড়ির কাজের খোঁজ নিতে পারেন।
নিজের এই অর্জনে উচ্ছ্বাসে আপ্লুত বিআর বিলকিস বলেন, ‘যে কোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; এটি আমার বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মাননা আমাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করতে এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও বেশি নিষ্ঠার সাথে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।’
শিক্ষিকা নিপা ভৌমিক বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো তার নিয়মনিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা। তিনি অত্যন্ত সময় সচেতন ও শিক্ষাবান্ধব একজন মানুষ। ব্যক্তিগত সময়ের তোয়াক্কা না করে তিনি তার পুরোটা সময় শিক্ষার্থীদের পেছনেই বিলিয়ে দেন। তার এই কর্মনিষ্ঠা ও আদর্শ অনুসরণ করেই আমরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
শিক্ষিকা ইসরাত জাহান বলেন, ‘আমার দেখা মতে তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী চিন্তার একজন শিক্ষক। শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠনে তিনি নতুন নতুন কৌশল প্রয়োগ করেন। শিক্ষাপদ্ধতিকে আরও ফলপ্রসূ করতে তিনি শিক্ষকদের নিয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক সভা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।’
শিক্ষিকা নাজমা আক্তার বলেন, ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তার রয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও আন্তরিকতা। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি যেমন বিদ্যালয় পরিচালনা করেন, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানোন্নয়নেও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।’
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক আমাদেরকে সারিবদ্ধভাবে স্কুলে প্রবেশ করান। বিদ্যালয়ে ভাষা ক্লাব, বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব, ইংরেজি ক্লাব পরিচালনা করেন। বিদ্যালয়ে ছাদ বাগান করেন এবং আমাদের খুব যত্ন করেন। আমরা শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষককে ছাদ বাগানের কাজ ও স্কুল পরিচ্ছন্নতার কাজে সহযোগিতা করি।’
উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ে গতিশীলতা আনা, মান উন্নয়ন ও শিক্ষকদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এই জাতীয় শিক্ষা পদক দেওয়া হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়। বিআর বিলকিসের এই অসামান্য অর্জনে পুরো সোনারগাঁ উপজেলায় আনন্দের বন্যা বইছে।