ইরানের কেশম দ্বীপে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘অনেক অগ্রগতি’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। খবর, আল জাজিরার।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি নতুন স্থাপনা ধ্বংস করেছে মার্কিন বাহিনী। তার ভাষ্য, স্থাপনাটি ধ্বংস করতে পাঁচ থেকে ১৫ মিনিট সময় লেগেছে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ছোটখাটো হামলা চালাই। তারা বিমান প্রতিরক্ষার জন্য একটি ছোট ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। আমরা সেটি প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে, হয়তো পাঁচ মিনিটেই ধ্বংস করে দিয়েছি।’
এর কিছুক্ষণ আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর প্রকাশ করে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত এই দ্বীপটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দেশটির সেনাবাহিনীর বরাতে আরও জানায়, কেশম দ্বীপের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী।
এদিকে, কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবরের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, পরিস্থিতি ‘তুলনামূলক শান্ত’ রয়েছে। আলজাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে সেন্টকমের এক কর্মকর্তা জানান, তারা বিস্ফোরণের খবর সম্পর্কে অবগত আছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় সেন্টকম। পোস্টে বলা হয়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ— বিশেষ করে বিজ্ঞানী ও গবেষক এবং এসবের স্থানান্তর সম্পর্কে তথ্য দিলে এই পুরস্কার দেওয়া হতে পারে। তথ্যদাতাকে প্রয়োজনে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগও দেওয়ার কথা জানিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
এর আগে সোমবার ইরানের সংবাদমাধ্যম কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করেছিল। একই সময়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনী ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে।
তেহরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প একাধিকবার জানান, তেহরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তার প্রশাসনের আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলেও দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে— এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবর প্রচার করে কেবল তারাই লাভবান হবে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে এবং অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখতে চায়।
শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান বিন জাসিম আল থানি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, এই সংকট অমীমাংসিত অবস্থায় ফেলে রাখা যায় না।
তিনি বলেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা কমানোর উপায় খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন তারা। এ প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আন্তরিকতাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে। তেহরানের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির ভূমিকার কারণেও পরিস্থিতি আরও বড় আকার ধারণ করা থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়েছে।
নির্বাচনের পর ইরান নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানে পরিবর্তন
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর শুক্রবারের হামলাকে ইরানে প্রথম নতুন সামরিক অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের জন্য ইরান যুদ্ধকেই দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর থেকে ইরানকে নিয়ে কখনো কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, আবার কখনো যুদ্ধের সমাধান কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো ইরানের বাকি অংশ ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে। তিনি এমন কিছু করলে তা শিগগিরই সবাই জানতে পারবে বলেও মন্তব্য করেন।
এদিকে, বুধবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেন্টাগনের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের বরাতে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের নির্দেশ পেলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবারও শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি এবং এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজে হাজার হাজার মার্কিন বিমান ও নৌসেনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, ইরানে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা আবারও শুরু হতে পারে— ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতের মধ্যে তেহরানও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। ফলে একদিকে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা— দুইয়ের মধ্যেই এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরিস্থিতি।